জীবন অতিক্রম করে (Sagrada Família, Spain)

যে কোন মহান সৃষ্টি জীবনকে ছাড়িয়ে যায়, সেই সৃষ্টি জীবনকে অতিক্রম করে যাত্রা করে অনাগত প্রজন্মের জনস্রোতের দিকে, মহান শিল্পীর জীবন থেকেও বৃহৎ হয় সেই সৃষ্টির জীবন। Antoni Gaudí  র জীবন থেকেও বৃহৎ, মহান যে সৃষ্টি – Sagrada Família, সেই মহৎ সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে বড়ই তুচ্ছ বলে মনে হয়। মনে হয়, কালের যাত্রায় খুব কম লোকই ঠাঁই পায়।

Antoni Gaudí র কাজ, শিল্প বহুদিন ধরে শুধুই তাঁর দেশের মানুষের কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল, বিশ্ব দরবারে তাঁর কাজের প্রশংসা বহুদিন হয় নি। কিন্তু, আজ বার্সিলোনা শহরকে Antoni Gaudí র সৃষ্টিই সম্বৃদ্ধ করেছে, তাঁর শিল্পের টানে বহু লোক বার্সিলোনায় ফিরে আসে। তাঁর কাজের প্রেরণা ছিল স্থাপত্য, প্রকৃতি ও ধর্ম। তাই তাঁর স্থাপত্য শিল্পে বার বার প্রকৃতির সহনশীলতা, ধৈর্য, উদারতা, অভিনবতা দেখা যায়। Gaudí র সৃষ্টি এই চার্চ Sagrada Família র গড়নে দেখা যায় গথিক স্থাপত্য ও Art Nouveau শিল্পের সমন্বয়, মাধুর্য ও কারুকাজ।

একশো বত্রিশ বছর ধরে এই চার্চ তৈরি হয়ে চলেছে, যদিও অসম্পূর্ণ কিন্তু, এই চার্চ UNESCO World Heritage Site  এর অন্তর্গত। ১৮৮২ সালে এই চার্চের কাজ শুরু হয়,  Gaudí  ১৮৮৩ তে Sagrada Família র কাজে হাত দেন ও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই প্রোজেক্টে কাজ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু, Gaudí তাঁর জীবনের মহৎ এই কল্প-সৃষ্টির সম্পূর্ণ বাস্তবিক রূপ দেখে যেতে পারেন নি, ১৯২৬ সালে যখন তিনি মারা যান, চার্চের কাজ মাত্র এক চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ হয়েছিল। তাঁর জীবন থেকে বড় ছিল তাঁর শিল্পের পরিধি, তাঁর কর্মের পরিধি, সর্বপোরি তাঁর চিন্তার প্রসার। তাঁর কাজে কোন তাড়া ছিল না, যেন তিনি প্রকৃতির কাছে শিখেছিলেন ধ্যান মগ্নতা, ধৈর্য।

এই চার্চের গায়ে গায়ে যেন প্রকৃতি থেকে উঠে এসেছে অনেক প্রতীক, রহস্য। চার্চের বাইরে কচ্ছপের পিঠের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা থাম যেন স্থায়িত্বের প্রতীক। চার্চের ভেতরের উঁচু থাম ও তার কারুকার্যে যেন জঙ্গলের গহন ভাব, রহস্যময়তা, ভেতরে এসে মনে হয় যেন বহু পাথুরে গাছ শাখা প্রশাখা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। চার্চের ভেতরে দিনের স্বাভাবিক আলো ঢোকানোর চমৎকার অবিনব উপায়, ঠিক যেমন ভাবে জঙ্গলে গাছের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে আলো ঢোকে, তেমনি ব্যবস্থা এখানে।

ভেতরে এখনও কাজ চলছে, দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে বিপদজ্জনক ভাবে কাজ করছে কর্মীরা। অসম্পূর্ণ, তবুও প্রতিদিন প্রচুর টুরিস্ট এই চার্চ ও তাঁর কর্ম যজ্ঞ দেখতে আসে। এই চার্চের গায়ে খ্রিস্টের জীবনকাহিনী আধুনিক Art Nouveau  শিল্পের মাধ্যমে ধরা পড়েছে, আর সেই Art Nouveau  স্টাইলই Sagrada Família  র বৈশিষ্ট।

Sagrada Família স্পেনের বুকে যুগ পরিবর্তন দেখেছে, দেখেছে দু’ দুটো বিশ্ব যুদ্ধ, দেখেছে স্প্যানিশ গৃহ যুদ্ধ। স্প্যানিশ গৃহ যুদ্ধের সময় বহুদিন এই চার্চ তৈরির কাজ বন্ধ ছিল, এমনকি গৃহ যুদ্ধের প্রভাবে Gaudí র তৈরি এই চার্চের অনেক ডিজাইন নষ্ট হয়ে যায়, যদিও এখন আধুনিক পদ্ধতিতে সেই নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিজাইনকে অনেকাংশেই পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, ও Gaudí র সৃষ্টি সেই ডিজাইনকে অনুসরণ করে আজ চার্চ তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে।

অতীতের সেই কাজকে আজ কম্পিউটার ও মেশিন অনেকটাই দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আজ Sagrada Família কর্তৃপক্ষ আশা করে ২০২৬ এ এই কাজ সম্পূর্ণ হবে। মহান শিল্পীর মৃত্যু শতবার্ষিকীতে এই চার্চের কাজ সম্পূর্ণ করে স্পেন Antoni Gaudí  কে শ্রদ্ধা জানাতে চায়।

এখানে এসে মনে হয় এতো কম সময় নিয়ে পৃথিবীতে এসে সংসারের সীমার মধ্যে থেকে অসীমকে কল্পনা করার শক্তি খুব কম মানুষই পায়। আর যারা পায় তাঁরাই মহৎ, তাঁদের সৃষ্টির সামনে এসে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। ফিরে আসি এক জীবন বোধ নিয়ে, জীবন অতিক্রম করে বাঁচার প্রত্যাশা নিয়ে।

Advertisements

About abakprithibi

I see skies of blue and clouds of white, The bright blessed day, the dark sacred night And I think to myself what a wonderful world...........
This entry was posted in Europe, Spain, Travel and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s