তৃতীয় শুরু

তেইশ বছর বয়সে মীরা যখন বিয়ের পিড়িতে বসল, সে  বিশ্বাস করত, বিয়ে এমন একটি আশ্রয় যেখানে একজন নারী নিরাপদ বোধ করবে, সমাজে স্থান পাবে, সম্মান পাবে। মনে করত বিয়ে মানে এক শক্ত আজন্ম সামাজিক মধুর বন্ধন। বিয়ে নিয়ে সে অনেক স্বপ্নও দেখেছিল।  

সে ভাদোদরার একটি ছোট হাসপাতালে নার্স  ছিল। নার্স হিসেবে তার হাত ছিল স্থির, কণ্ঠ ছিল কোমল, সহানুভুতি জড়িত কণ্ঠ – সে বিশ্বাস করত অনেক সময় মানুষ একটু সহানুভুতি পেলেই স্বস্তি পায়।

 রোগীরা তাকে বিশ্বাস করত। ওর ছোঁয়ায় শিশুদের কান্না থেমে যেত। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে বয়স্ক মহিলারা তার হাত ধরে আশীর্বাদ করতেন।

কিন্তু, এদিকে নিজের বাড়িতে মীরা এক অন্যরকম নীরব কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল।

তার স্বামী রাকেশ বিয়ের আগে ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু, বিয়ের পরে তার কথাগুলো ক্রমে কঠোর ও রুক্ষ হয়ে উঠছিল।

মীরার দীর্ঘ ডিউটি, ক্লান্তি, রান্না, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলাও তার অপছন্দ ছিল। পান থেকে চুন খসলেই শুরু হত চিৎকার চ্যাঁচামেচি।

সে বলত, “হাসপাতালে কাজ করো বলে নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবতে শুরু করেছ। সংসারের দিকে একফোঁটা মন নেই – এই ভাবে চলতে পারে না।”

দুই বছর ধরে মীরা বিয়েটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল।

সে ডিউটির সময় বদলেছিল, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করেছিল, আর নিজেকে বোঝাত যে ধৈর্য ধরলে রাকেশ একদিন বদলে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় বদলে গিয়েছিল কিন্তু কিছুই ঠিক হয় নি, রাকেশ বদলায়নি, বরং অসভ্যতা, বর্বরতা আরও বেড়ে গিয়েছিল।

এক সন্ধ্যায়, দীর্ঘ রাতের ডিউটির পরে, মীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ ক্লান্ত, আর আয়নায় দেখা মানুষটিকে সে যেন চিনতেই পারছিল না – কোথায় গেল সেই মিষ্টি, হাসিখুশি মেয়েটির মুখ।

নাঃ, আর নয়, অনেক হয়েছে। পরদিন সকালেই সে একটি স্যুটকেস গুছিয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে গেল।

চলে যাওয়ার চিন্তাটি যতটা সহজ বলে মনে হয়েছিল, কাজে ব্যপারটা এতটা সহজও ছিল না। আশেপাশের লোকজন নানা কথা বলেছিল। কেউ বলেছিল, তার আরও চেষ্টা করা উচিত ছিল। কেউ বলেছিল, একজন নারীর জীবন এমনিতেই সহজ হওয়ার কথা নয়। কেউ বলেছিল, স্বামীর বাড়ীতে ফিরে যাও – ওখানেই মেয়েদের স্থান। মেয়েদের জীবন অনেক কঠিন – মানিয়ে নিতে হয়।

কিন্তু, মীরা তখন নিজের  জীবন দিয়ে একটি কথা বুঝে গিয়েছিল—কঠিন জীবন আর অন্যের চাপিয়ে দেওয়া অসুখী জীবন এক জিনিস নয়। বরং নিজের কঠিন ও অসুখী জীবনের মধ্যে ও কঠিন জীবনকেই মেনে নেবে। অন্যের তৈরি করে দেওয়া অসুখী জীবন কখনই মেনে নেবে না।

কয়েক বছর পরে বাবা মা ও সমাজের চাপে মীরা আবার বিয়ের পিড়িতে বসল। বলা যায় বিয়ে করতে বাধ্য হল।

তার দ্বিতীয় স্বামী সমীর প্রথম দিকে খুবই আকর্ষণীয় ও যত্নশীল ছিল। অফিস ফেরত সে ফুল নিয়ে আসত, একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলত, আর প্রতিশ্রুতি দিত যে মীরাকে কখনও একা অনুভব করতে দেবে না – এক নতুন জীবন শুরু করবে।

কিছুদিনের জন্য মীরা তাকে বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু, ধীরে ধীরে সেই যত্নশীলতা, বিশ্বাস, সেই মমতা কোথায় যেন হারিয়ে গেল – মরুভূমিতে এক বিন্দু জল যেমন নিমেষে শুকিয়ে যায় ঠিক তেমনি শুকিয়ে গেল সমীরের ভালোবাসা, নাকি ভালোবাসার নাটক – কে জানে।

সমীর তার টাকা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, প্রতিটি ফোনকল নিয়ে প্রশ্ন তুলত, আর মীরা আবার নার্সের সম্পূর্ণ ডিউটি করতে চাইলে রেগে যেত। রাকেশের মতো সে সবসময় চিৎকার করত  না  বটে , কিন্তু তার কঠোরতা ছিল আরও নীরব, শীতল, কঠিন।

সে বলত,
“তোমাকে বিয়ে করেছি, এটাই তোমার ভাগ্য। আগের সবকিছুর পরেও।”

এই কথাগুলো মীরাকে গভীরভাবে আঘাত করত। কষ্ট দিত, মীরা গুমড়ে মরত। এক মুঠো মুক্তির খোঁজ করত – ভাবতো সমস্যা কি তাহলে আমার মধ্যেই। পৃথিবীর লক্ষ মানুষ তো এক সম্পর্ককেই জীবন কাটিয়ে দেয় – আমিই বা কেন পারছি না? সমস্যা কোথায়?

কিন্তু, এবার সে এই সম্পর্কের পেছনে বেশী সময় নষ্ট করে নি, সে এক বছরও অপেক্ষা করেনি।

ওর মনে দুঃখ ছিল, কিন্তু পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিয়ে সে সেই বিয়েও ভেঙ্গে দিল। না মীরার মনে কোন গ্লানি ছিল না, ছিল না কোনও ব্যর্থতাবোধ – শুধু সে এই মেনে নেওয়া-মানিয়ে নেওয়ার সামাজিক দোলনায় দুলতে চায় নি।

সে শুধু এমন একটি সম্পর্কে থাকতে অস্বীকার করেছিল, যেখানে তাকে, তার স্বাধীনতাকে  সম্মান করা হয় না। যেখানে তার অন্তরাত্মাকে পদে পদে অপমানিত হতে হয় সেই সম্পর্কে সে জীবন ভর কেমন করে থাকবে? নিজেকে বার বার সেই প্রশ্নে সে জর্জরিত করে তুলেছিল।

জীবন চলছিল, যাপন চলছিল – ঠিক যেমন চলে – একটা দিনের পিঠে আরেকটা দিন- একই কাজের পুনরাবৃত্তি।   

কিছুদিন পরে তার এক পুরনো সহকর্মীর মাধ্যমে দুবাইয়ে নার্স হিসেবে কাজের সুযোগ এল।

মীরা আগে কখনও ভারতের বাইরে যায়নি। অন্য দেশে একা থাকার কথা ভেবে তার ভয় লাগত। বাবা-মা ও চিন্তিত ছিলেন। আত্মীয়স্বজনেরও নানান মত ছিল।

-অচেনা দেশে একটা একা মেয়ে! কেউই মেনে নিচ্ছিল না, কিন্তু মীরা অনেকক্ষণ ধরে চাকরির অফার লেটারটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সে ভাবল – “ যখন কেউ আমার জীবন ঠিক করে দেবে না, আমাকেই ঠিক করতে হবে আমি কি করব । আমি জানতে চাই, আমি কে হতে পারি। কি হতে পারি। নিজেকে আমাকে উদ্ধার করতেই হবে। স্বাধীন হতেই হবে।”

দুবাই প্রথম দিকে তাকে অভিভূত করে দিয়েছিল।

সেখানকার গগন চুম্বী অট্টালিকার সারি, তার দেখা সবকিছুর চেয়ে অনেক বড় ছিল। রাস্তাগুলো যেন শেষই হতো না। তার হাসপাতালে নানা দেশের মানুষ আসত, নানা ভাষায় কথা বলত, আর প্রত্যেকের জীবনেই ছিল আলাদা গল্প।

মীরা ইমারজেন্সি বিভাগে দীর্ঘ সময় কাজ করত। সে শ্রমিকদের চিকিৎসা করত, ব্যবসায়ি,  ভ্রমণকারীদের দেখাশোনা করত, জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের সেবা করত, আর বাড়ির জন্য মন খারাপ করা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রোগীদের পাশে বসত। সে কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে শিখল, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শিখল, আর নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর ভরসা করতে শিখল।

কাজের বাইরে সে নিজের একটি জীবন গড়ে তুলতে শুরু করল।

সে এমন একটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিল যেখানে সকালে রোদ আসত। সে একা একা শহরের আনাচে কানাচে যাতায়াত করতে শিখল। সপ্তাহান্তে একটি বই পড়ার দলে যোগ দিল।

সে বাড়িতে টাকা পাঠাতে শুরু করল, কারও চাপের কারণে নয়, নিজের ইচ্ছায় – বাবা মাকে টাকা পাঠাতে পেরে ও নিজেকে ধন্য মনে করতো – পৃথিবীতে ঐ দুই জন মানুষই সর্বদাই ওর পাশে আছে – ওরা মীরার মানসিক শান্তির উৎস।

অনেক বছর পরে প্রথমবারের মতো মীরা শান্তি অনুভব করল।

মীরার প্রতিদিন আনন্দে ভরা ছিল – এ কথা বলা যায় না। একাকীত্বও ছিল। কিন্তু, তার ভেতরেও ছিল এক ধরনের শান্ত স্থিরতা।

সময় কেটে গেল।

চল্লিশের কাছাকাছি এসে মীরা আর মনে করত না যে পূর্ণ জীবন পাওয়ার জন্য বিয়ে অপরিহার্য। তার বন্ধু ছিল, নিজের পেশা ছিল, স্বাধীনতা ছিল, আর নিজের কাছে নিজে হয়ে ওঠা মানুষটির জন্য এক নীরব গর্ব ছিল।

তারপর তার সঙ্গে পরিচয় হলো অরবিন্দের।

অরবিন্দ ছিলেন দুবাইয়ে বসবাসকারী একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। তিনি চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের একটি ছোট ব্যবসা চালাতেন। হাসপাতালের একটি অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা হয়। তিনি মীরার সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, মন দিয়ে শুনেছিলেন, আর অর্থ বা বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেননি।

ধীরে ধীরে তারা কফির জন্য দেখা করতে শুরু করল।

অরবিন্দ মীরার অতীত সম্পর্কে জানতেন।

এক সন্ধ্যায় মীরা বলল,
“আমি দুবার বিয়ে করেছি। দুবারই ভেবেছিলাম, সবকিছু একদিন ভালো হয়ে যাবে।”

অরবিন্দ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“এখন তুমি কী চাও?”

মীরা একটু ভেবে বলল,
“আমি সম্মান চাই। আমি শান্তি চাই। আমি চাই না, কারও জীবনের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে।”

অরবিন্দ মাথা নাড়লেন।

তিনি বললেন,
“এটা খুবই ন্যায্য চাওয়া। আমিও চাই না তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলো।”

তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীর হলো।

সেই সম্পর্কে কোনও নাটকীয় ঘোষণা ছিল না। ঘটনার ঘনঘটা ছিল না।

জীবন সবসময় নিখুঁত থাকবে—এমন কোনও প্রতিশ্রুতিও ছিল না। ছিল – কথা বলা, অনেক কথা বলা, মতের অমিল হলে ধৈর্যের সঙ্গে তা সামলানো, আর ছোট ছোট যত্নের প্রকাশ।

অরবিন্দ মীরার কাজকে সম্মান করতেন। তিনি কখনও তাকে নার্সিং ছেড়ে দিতে বলেননি। মীরা যখনই ভারতে যেতে চাইত, তিনি তাকে উৎসাহ দিতেন। আর মীরার বাবা-মা দুবাইয়ে এলে তিনি তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাতেন।

যখন অরবিন্দ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, মীরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়নি।

সে সময় নিয়েছিল।

সে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিল। নিজের সঙ্গেও কথা বলেছিল। সে মনে করেছিল সেই পঁচিশ বয়সের মেয়েটির কথা, যে একদিন ভোরবেলা একটি মাত্র স্যুটকেস গুছিয়ে আকাশ ভরা ভয় ও অনিশ্চয়তা নিয়েও দৃঢ় সিদ্ধান্তে প্রথম স্বামীর বাড়ি ছেড়েছিল।

অবশেষে সে বলল, “হ্যাঁ।”

তৃতীয় বিয়ের দিন মীরা একটি সাধারণ রেশমের শাড়ি পরেছিল। তার চুলে তখন রুপালি ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, আর সে সেগুলো লুকানোর চেষ্টাও করেনি। তার বাবা-মা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, চোখে জল আর গর্ব নিয়ে।

চারপাশে তাকিয়ে মীরা বুঝতে পারল, এই বিয়ে তাকে উদ্ধার করার জন্য নয়।

সে তো নিজেই নিজেকে অনেক আগেই উদ্ধার করেছে।

এটি তার জীবনের শুরু নয়।

এটি শুধু আরেকটি অধ্যায়—যেখানে সে প্রবেশ করছে খোলা চোখে, খোলা মনে, স্থির হৃদয়ে, এবং এই বিশ্বাস নিয়ে যে  – জীবনে যা-ই ঘটুক, সে আর কখনও নিজেকে ত্যাগ করবে না। নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাবে না।

অজানা's avatar

About abakprithibi

I see skies of blue and clouds of white, The bright blessed day, the dark sacred night And I think to myself what a wonderful world...........
This entry was posted in Uncategorized and tagged , . Bookmark the permalink.

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান