
সবে তখন কলেজের চৌকাঠ ছুঁয়েছি – চোখে তখন অনেক স্বপ্ন – বদলে দেওয়ার, পালটে দেওয়ার, পাল্টে যাওয়ার – প্রতিটি পদক্ষেপে জীবনের হাতছানি – নতুনকে আবিষ্কারের নেশা। অচেনা অনেক অনুভূতি বুকের কোণে হঠাৎ করে জেগে ওঠে – জানি না ঐ অনুভূতি গুলোর কি নাম – এক দুলন্ত সময়ের মধ্য দিয়ে পার হয়ে যাওয়া প্রতিটি দুপুর, প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি গোধূলি। সেই সময়েই শুনেছিলাম – উদাত্ত গলায় গাওয়া গান – বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন ?
ভুপেন হাজারিকার গলার সেই উদারতা, উদাসীনতা, সেই হাহাকার যে কখন চুইয়ে চুইয়ে হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করে দিয়েছিল জানি না।
গঙ্গাকে উৎস থেকে দেখার ইচ্ছেটা আরও গভীর হয়েছিল যখন শুনেছিলাম – আমি গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভল্গার রূপ দেখেছি।
গঙ্গার রূপের গল্প বার বার শুনেছি, বহুবার শুনেছি । শুনেছি গঙ্গা কেমন বহু শহরের পাশ দিয়ে জীবন দিতে দিতে বয়ে গেছে
শুনেছি হৃষীকেশ, রুদ্রপ্রয়াগ, হরিদ্বারের গঙ্গার কথা – উফ্, এই জায়গা গুলোর নামেই মধ্যেই যেন আছে ঘর ছাড়ার ডাক, বৈরাগ্যের নেশা, স্মৃতির ছোঁয়া।
রুদ্রপ্রয়াগ – জায়গাটির নামটা শুনলেই বাবার কথা মনে পড়ে – ছেলেবেলায় বাবার মুখে হৃষীকেশ, লছমনঝোলা, গঙ্গোত্রী, রুদ্রপ্রয়াগের নাম শুনেছি, গল্প শুনেছি– শুনেছিলাম, আমার এক কাকা ঘর ছেড়ে হিমালয়ে চলে গিয়েছিল।
বাবা প্রায়ই বলত – প্রয়াগ, গঙ্গোত্রী, হরিদ্বারেই হয়তো গেছে – যাব একদিন ওকে খুঁজতে, হয়তো গঙ্গোত্রী বা হৃষীকেশের গঙ্গার ধারেই ওকে পেয়ে যাবো। না, বাবা আর কাকাকে খুঁজতে যেতে পারেনি। নিজেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছিল।
এই জায়গা গুলোর নামেই যেন বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে, বহু গল্প লুকিয়ে আছে, বহু না বলা কথা যেন আজও এই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গুঞ্জরিত হয়। হাজার বছরের বহু গল্প বুকে নিয়ে বহু রহস্যে মোড়ানো এই জায়গা।
তাই, এই জায়গায় যাওয়া মানে শুধু যে ভ্রমণ তা নয় – এই জায়গা গুলোয় এলে যেন গহন মনের আধ্যাত্মিকতার এক স্পর্শ পাওয়া যায়। এই জায়গা গুলোয় যেন এমন কোন কিছু এক অনুভূতির ছোঁয়া আছে, এখানে এসে মনে হতেই পারে এখানেই লুকিয়ে আছে জন্ম জন্মান্তরের আসা যাওয়ার কথা, আধ্যাত্মিকতার কথা।
হৃষীকেশের গঙ্গার ধারে বসে সন্ধ্যার আরতি দেখা, কিংবা গঙ্গার ধার ঘেসে হেঁটে যাওয়া – সব কিছুই যেন এক অন্য জগতের গল্প। আর গঙ্গা সব গল্পের নায়িকা।
সময় চলে যায় সময়ের হাত ধরে, বুঝি কিছুই বদলায় না, পালটায় না, জীবন চলে নিজের মতো ভেসে ভেসে, নিজের তালে, ঠিক নদীর মতো – শুধু হাল ধরে থাকতে হয় – প্রহরী হয়ে, প্রতিটি মুহূর্তে সময়ের হাত চেপে ধরে চলতে হয়।
হৃষীকেশে এসে পড়ন্ত বিকেলে গঙ্গার ধারে পরমার্থ নিকেতন আশ্রমের সামনে বসে আবার শুনলাম ভুপেন হাজারিকার গলার সেই গান – ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?
গঙ্গা আরতির সময়ে এই গান!
সন্ধ্যা নামছে, ফেব্রুয়ারির ঠাণ্ডা হাওয়ায় বৈরাগী স্বাধীনতা। গঙ্গার কলকল স্রোতে সূর্যাস্তের কমলা আলোর ঝিলিক, আর মাইকে ভেসে আসছে সেই উদার গাওয়া গান – অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?
হৃষীকেশের গঙ্গার ধারে বসে, চোখ বুজে গান শুনতে শুনতে, সেই কলেজ জীবনের অচেনা বুক হু হু করা চিনচিনে অনুভূতি গুলো যেন বুকের কোণে এসে কড়া নেড়ে দিয়ে গেল – হুড়মুড় করে অনুভূতি গুলো এসে ভিড় করে দাঁড়াল – ভুলেই গিয়েছিলাম জীবনের সেই সময়কে, সেই অনুভূতি গুলোকে।
হয়তো একটা গান, একটা কবিতাই মানুষের জীবনের মুহূর্ত গুলোকে সঞ্চয় করে রাখে। এক ফালি স্মৃতি বহু সযত্নে তুলে রাখে।
সামনে বয়ে যায় গঙ্গার স্রোত, উদ্দেশ্য তার মোহনা – জীবনও চলে মোহনার পথে – জীবন, নদী সবই যে একই – শুধু বয়ে চলা।
***Image is generated by AI