পৃথিবী কোন দিকে? (How not to be ignorant about the world, Hans Rosling)

প্রতিদিনই কতো যে ছোট ছোট না পাওয়ার বেদনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ঘিরে রাখে। প্রতিদিনই খবরের কাগজের প্রথম পাতায়, টিভি নিউজের হেডলাইনে শুধুই তো দেখি ধ্বংস, যুদ্ধ, মারামারি, হানাহানি, রক্ত খরচ, লুটে নেওয়া, হারিয়ে যাওয়া, খরা, বন্যা, ভূমিকম্প – আর এই নিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন পাওয়া, না পাওয়ার এক পৃথিবী। এক নৈরাশ্যের পৃথিবী, আতঙ্কের পৃথিবী – যে পৃথিবী প্রতিদিন রসাতলের দিকেই যাচ্ছে।

আর সেই কারনেই যেন পৃথিবী থেকে আমাদের বিশ্বাস দিন দিন উবেই যাচ্ছে, বিশাল এই পৃথিবীর প্রতি কেমন এক বিশ্বাসহীনতায় আমরা আতঙ্কগ্রস্ত। প্রতিদিনই নানান সংবাদ মাধ্যমের তৈরি, অহেতুক, নেতিবাচক, আরোপিত জ্ঞ্যানে আমাদের চিন্তা ধারা এক ধূসর জালে আবদ্ধ। সকালে খবরের কাগজ পড়ে, সন্ধ্যার টিভির খবরে প্রচুর কারেন্ট নিউজ জেনেও কখনোই যেন ভাবতে পারি না – যে আমাদের পৃথিবী এক উন্নত, আশাবাদী, ভালো পরিণতির দিকে যাচ্ছে!

তাই, যখন TED Talk এ শিক্ষিত, সংবেদনশীল, চিন্তাশীল এক ঘর মানুষকে ও চিড়িয়াখানার শিম্পাঞ্জীকে Hans Rosling, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের মৃত্যু, নারী শিক্ষা, বিশ্ব দারিদ্র বিষয়ে তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন – দেখা যায়, পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ কখনোই আশবাদী উত্তর দেয় না, বরং শিম্পাঞ্জীরা পৃথিবীর সভ্যতা সম্বন্ধে কিছু না জেনেও, সন্ধ্যার খবর না জেনেও মানুষের চেয়ে বেশী আশাবাদী উত্তর দিয়েছে! এমনকি যারা প্রতিদিন খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে খবর সরবরাহ করে – সাংবাদিক, তারাও শিম্পাঞ্জীর বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে গেছে? ওরাও শিম্পাঞ্জীর চেয়ে বাজে উত্তর দিয়েছে!

তাহলে সমাধান কি? শিম্পাঞ্জীদের চেয়ে ভালো উত্তর দেওয়ার রহস্য কি? এতো জেনে, পড়াশোনা করে, শেষ পর্যন্ত শিম্পাঞ্জীদের কাছে মানুষকে হেরে যেতে হবে? সমাধান একটাই – পৃথিবীর প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে হবে, নিজেদের অনুমান শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে যাচাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে – পৃথিবী, তার মানুষ ও তাঁদের সভ্যতা উন্নত পরিণতির দিকেই যাচ্ছে।

প্রতিদিনের ছোট ছোট চিন্তায় ও কাজে সেই হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই শিম্পাঞ্জীর বুদ্ধিমত্তার কাছে মানুষকে আর হারতে হবে না। মানুষকে সঠিক যুক্তি, বুদ্ধি, সঠিক তথ্যের উপর নির্ভর করেই চলতে হবে – যা শুধুমাত্র মানুষেরই একাধিপত্য। মানুষকে ভালো থাকার, পরিস্থিতিকে ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়ার এক আশাবাদী বিশ্বাস, ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই বাঁচা উচিত।

Posted in Inspirational | Tagged , | Leave a comment

ফোয়ারার পাশে (Gefion Fountain, Copenhagen, Denmark)

পৃথিবীর কোন এক প্রান্ত – কোপেনহেগেন বন্দরের পাশের Langelinie পার্কের দক্ষিণের এক দিকে, অক্টোবরের ধূসর মেঘলা দিনে, এক হলুদ পাতা ঝরা গাছের পাশে, এক বিশাল ফোয়ারা – Gefion ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে সেদিন ঠিক কি ভেবেছিলাম, আজ সেটা একদম মনে নেই, কিন্তু সেই ছবি দেখে এক ঝটকায় যেন সেই দিনেই ফিরে যাই। অক্টোবরের দিনটি, সেদিন ছিল খুবই মেঘলা, বাতাস ছিল ভেজা, আর পরিবেশ ছিল হিম ঠাণ্ডা। ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে যে টুকু জলের ছিটে গায়ে লেগেছিল, মনে হচ্ছিল যেন বরফ কুচির ছিটে।

ফোয়ারার ঠিক উপরে দামাল, মত্ত, উগ্র পশুর দলকে তরোয়াল হাতে বশে আনার চেষ্টায় রত স্ক্যান্ডানেভিয়ার পুরাণের দেবী Gefion। পুরাণে কথিত – দেবী Gefion ডেনমার্কের সবচেয়ে বড় দ্বীপ Zealand সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে আজকের এই কোপেনহেগেন শহর। Zealand দ্বীপ তৈরির সময়ে দেবী Gefion  এর অসীম ক্ষমতা, শক্তি, শৌর্য এই স্ট্যাচুর খাঁজে খাঁজে প্রকাশ পেয়েছে।

কথা ছিল, ডেনিশ ভাস্কর Anders Bundgaard এর তৈরি দেবী Gefion এর স্ট্যাচুটি শহরের ভেতরে স্থাপিত হবে, কিন্তু অবশেষে এই বিশাল পার্কে এর স্থান হয়েছে।

এই ফোয়ারার স্বচ্ছ জলে চোখ রাখলে, ভেতরে দেখা যায় প্রচুর খুচরো পয়সা। ফোয়ারার দিকে পেছন করে চোখ বন্ধ করে মাথার পেছন দিকে খুচরো ফেললে নাকি ইচ্ছে পূর্ণ হয়। ইউরোপের অনেক জায়গার ফোয়ারাতে দেখেছি এমনি খুচরো ফেলার চল আছে। ইতালিতে ত্রিভেই ফোয়ারার সামনে তো জায়গাই পাওয়া যায় না দাঁড়ানোর – সবাই চায় চোখ বন্ধ করে ফোয়ারার দিকে পেছন করে জলে পয়সা ফেলতে। কি আশ্চর্য, পৃথিবীর সব দেশের মানুষের সরল বিশ্বাসের ধরণ গুলো কেমন যেন একই বলে মনে হয়।

ইউরোপের পথে চলতে চলতে যেখানেই গেছি, দেখেছি এক একমুঠো জীবনের ছবি, অপূর্ব প্রকৃতির ছবি, স্থাপত্য, শিল্প, ভাস্কর্যের ছবি – আর সেই ছবি এঁকে নিয়েছি চেতন ও অবচেতন মনের এক গহন গভীর বিশাল ক্যানভাসে। জীবনের চলার পথে কতো যে ছবি তৈরি হয়, কতো ছবি যে চলার পথে জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়। কখনো জীবনের কোন এক হলুদ নরম আলোর পড়ন্ত দুপুরে হঠাৎ কোন এক ধূসর বৃষ্টি ভেজা দিনের ছবি ভেসে ওঠে, আশ্চর্য হই – ভাবি সেদিন আমরা ছিলাম সেই ছবির প্রেক্ষাপটে?

Posted in Travel, Europe, Denmark | Tagged , , , , , , , , , , , | Leave a comment

কোপেনহেগেনের প্রাসাদে (Amalienborg, Copenhagen, Denmark)

ঠিক দুপুর বারোটায় লাল নীল রঙিন পোশাকের রাজপ্রহরীদের ছন্দ বদ্ধ চলার ছন্দে কোপেনহেগেন শহর ও তার Amalienborg প্রাসাদ চত্বর বেশ সরগরম হয়ে ওঠে। বিশাল প্রাসাদ চত্বর ঘিরে প্রচুর টুরিস্ট ডেনমার্কের রাজকীয় সেনাদের কুচকাওয়াজ সহযোগে প্রহরী বদলের অনুষ্ঠান দেখতে জমায়েত হয়। অবশ্য কোপেনহেগেন বাসীর কাছে নিত্য দিনের এই অনুষ্ঠান খুব একটা নজর কাড়ে না, কুচকাওয়াজ চলাকালীন স্থানীয় অনেকেই সাইকেল নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায় – এই প্রাসাদের প্রহরী বদলের আসল দর্শক তো বাইরের মানুষ!

ডেনমার্কের রাজপরিবারের শীতকালীন বাসস্থান ছিল এই Amalienborg প্রাসাদ।  অষ্টভুজ আকারের বিশাল প্রাসাদ চত্বরের চারদিকের চারটে একই রকম স্থাপত্যের উপস্থিতি এই প্রাসাদকে ইউরোপের মধ্যে ব্যতিক্রমী করেছে, আর প্রাসাদ চত্বরের একদম মধ্যে আছে রাজা Frederick V এর স্ট্যাচু। ঐতিহাসিক সময় থেকে বিশাল চত্বরের চারদিকের এই চারটে প্রাসাদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজ পরিবার বাস করে গেছে, আর তাঁদের বসবাসের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে rococo স্টাইলে তৈরি প্রাসাদের অন্দরসজ্জায়, ব্যবহৃত আসবাব পত্রে।

ঠিক সন্ধ্যার আগে একবার এই চত্বরের প্রহরী বদল হয়, তবে দুপুরের মতো সমারোহ করে হয় না। কোপেনহেগেন এলে ডেনমার্কের রাজপরিবারের রাজকীয়তার আঁচ পেতে এই বিশাল চত্বরে অনেকেই পৌঁছে যায়। পাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বরে ঘুরে ঘুরে ঐ স্থাপত্যের গায়ে গায়ে জড়িয়ে থাকা ডেনিশ রাজকীয়তার আভাস পেতে চেষ্টা করে।

অক্টোবরের হিম শীতল ধূসর সন্ধ্যা নামার আগে যখন পৌঁছলাম রাজ প্রাসাদের চত্বরে, সন্ধ্যার আগের প্রহরী বদল চলছে। কুচকাওয়াজ করতে করতে একদল প্রহরী চলেছে – পরনে ওদের রাজ প্রহরীর জমকালো লাল নীল পোশাক, মাথায় মোটা কালো লোমের টুপি। অবশ্য, এই মাইনাস ঠাণ্ডায় শীতল পাথুরে চত্বরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রাজ দরজা পাহারা দিতে হলে ঐ ধরণের জমকালো টুপি ও পোশাক না হলে অচিরেই নিউমোনিয়া হতে বাধ্য।

গুটিকয় উপস্থিত টুরিস্টের সঙ্গে আমরাও কুচকাওয়াজরত প্রহরীর সঙ্গে সঙ্গে চলতে চলতে ডেনিশ রাজ প্রতিপত্তির সাক্ষী হই। প্র্যতেক দেশেরই রাজ প্রহরীদের এক জমকালো পোশাক থাকে, আর সেই ঐতিহ্যপূর্ণ পোশাকই টুরিস্টদের আকর্ষণ করে – আর সেই জন্যেই হয়তো সময় এখন যতই আধুনিক হোক না কেন ওরা এখনো সেই পোশাকে পুরনো বন্দুক নিয়েই পাহারা দেয়।

রাজা নেই, নেই রাজ পরিবার কিন্তু তার উপস্থিতির চিহ্ন, রাজত্বের চিহ্ন আজও ছড়িয়ে আছে এই জায়গার প্রতিটি ইটে, এই জায়গার উদার বিশাল চত্বরে, এই জায়গার পরিবেশে আর সেই উপস্থিতির অনুরণন শুনতে আজও পৃথিবীর নানা কোণের মানুষ রাজ দরবারের আঙিনায় এসে জড়ো হয়।

Posted in Denmark, Europe, Travel | Tagged , , , , , , , , , , , , | Leave a comment